বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০ পূর্বাহ্ন
যেখানে মানুষ নীরব, সেখানে কুকুরই দেখালো সাহস!
অনলাইন ডেস্ক
রাজধানীর ব্যস্ততম ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোড যেন এক রক্তাক্ত নৈশভোজের সাক্ষী হয়ে উঠেছিল ১৮ মে, রবিবার রাতে। শহরের কোলাহল আর আলো-আঁধারির মাঝে, ভূতের গলির নির্জন এক কোণে সাইফ হোসেন মুন্না নামের এক যুবকের ওপর নেমে আসে এক দল হিংস্র দুর্বৃত্তের বর্বর হামলা। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি যেন নগরের হৃদয়হীনতার প্রতিচ্ছবি। সেই সময় আশপাশে উপস্থিত ছিল বেশ কিছু মানুষ, কিন্তু কেউই সাহস করেনি এগিয়ে যেতে, কেউই হাত বাড়ায়নি এক রক্তাক্ত মানুষের আর্তনাদে সাড়া দিতে।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া মুহূর্তগুলো ছিল বিভীষিকাময়। দেখা যায়, একদল যুবক হঠাৎ করেই ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুন্নার ওপর। একের পর এক ছুরির কোপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে তার হাত, পা ও শরীরের নানা অংশ। রক্ত গড়িয়ে পড়ে রাস্তায়, মুন্না ছটফট করে বাঁচার আকুতি জানায়—কিন্তু মানুষরূপী উপস্থিত ছায়াগুলো যেন কংক্রিটের শহরের মতই ঠাণ্ডা ও প্রাণহীন। মানবিকতার এমন করুণ মৃত্যু দেখে যেন শিউরে উঠার কথা, কিন্তু বাস্তবতায় সবাই যেন চোখ ফিরিয়ে নেয়, যেন কিছুই ঘটেনি।
তবে, সেই মুহূর্তেই এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। সবকিছু ছাপিয়ে মানবতার প্রতীক হয়ে উঠে আসে একটি অবলা কুকুর। যেটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও মুন্নার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, চিৎকার করে, যেন ভয় দেখিয়ে তাড়াতে চায় হামলাকারীদের। নিরস্ত্র সে প্রাণীটিই ছিল একমাত্র যা মুন্নার পাশে দাঁড়াতে সাহস দেখিয়েছে, যখন তথাকথিত মানুষরা পরিণত হয়েছিল নির্বাক দর্শকে। কুকুরটির আচরণ যেন নগরবাসীকে এক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—মানুষের সংজ্ঞা কি কেবল চেহারায়? নাকি হৃদয়ে?
ঘটনার পর দুর্বৃত্তরা মুন্নাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করেন। তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত পাওয়া গেছে, বিশেষ করে হাত ও পায়ের ক্ষত ছিল ভয়াবহ। অথচ এত বড় ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি, পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এখনো কেউ মামলা করেনি।
এই ঘটনা যেন এক তীব্র সামাজিক সংকেত। আমরা বসবাস করছি এমন এক যান্ত্রিক নগরে, যেখানে মানুষ দিন দিন রোবটের মতো আবেগহীন হয়ে উঠছে। কারও রক্ত, কারও কান্না, কারও অসহায় আর্তনাদ—কোনো কিছুরই আর মূল্য নেই। বরং একটি অবলা প্রাণীই যেন হয়ে উঠেছে সাহস ও সহমর্মিতার প্রতিচ্ছবি। মুন্নার এই করুণ ঘটনার পেছনে শুধু দুর্বৃত্তদের দায় নয়, দায় আমাদের সবার—যারা পাশে থেকেও পাশ কাটিয়ে যাই। আমরা আজ এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে কুকুরের হৃদয় মানুষের চেয়ে বেশি জীবন্ত, বেশি মানবিক।
এটা কেবল একটি অপরাধের গল্প নয়, এটা আমাদের বিবেকের আয়না। প্রশ্ন শুধু একটাই—আমরা কি এখনো মানুষ আছি? নাকি এক নিঃশব্দ যন্ত্রসভ্যতার সদস্য হয়ে গেছি, যেখান থেকে হৃদয়ের শব্দ মুছে গেছে?